
বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় একটি অংশ কেটে যায় স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের পর্দার সামনে। অফিসের কাজ, পড়াশোনা, যোগাযোগ, কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিনোদন—প্রায় সবকিছুতেই প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। তবে এর প্রভাব শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; শরীরেও ধীরে ধীরে নানা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘাড় ও মেরুদণ্ডের সমস্যা, চোখের ক্লান্তি, হাতের শক্তি কমে যাওয়া এবং হাত-চোখের সমন্বয় ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার মতো ঝুঁকি বাড়তে পারে। সুখবর হলো, দৈনন্দিন কিছু সহজ অভ্যাস বদলালেই এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
টেক নেক: সবচেয়ে পরিচিত সমস্যা
ফোন ব্যবহার করার সময় আমরা অনেকেই দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে থাকি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ফরোয়ার্ড হেড পোশ্চার। এভাবে দীর্ঘ সময় থাকলে ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা ধীরে ধীরে ঘাড়, কাঁধ ও মেরুদণ্ডে ব্যথার কারণ হতে পারে। এই সমস্যাটিই পরিচিত ‘টেক নেক’ নামে।
এ ঝুঁকি কমাতে ফোন বা কম্পিউটারের স্ক্রিন যতটা সম্ভব চোখের সমতলে রাখুন এবং প্রতি কিছুক্ষণ পরপর বিরতি নিয়ে শরীর একটু নড়াচড়া করুন।
ঘাড়ে বলিরেখা, ত্বকেরও সমস্যা হতে পারে
অনেকে মনে করেন, দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে ফোন ব্যবহারের কারণে ঘাড়ে বলিরেখা পড়ে। যদিও এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তবে একই জায়গায় দীর্ঘদিন চাপ পড়লে ত্বকে ভাঁজ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় স্মার্টওয়াচ পরে থাকলে ঘড়ির নিচে ঘাম জমে ত্বকে চুলকানি, র্যাশ বা একজিমার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই নিয়মিত ত্বক পরিষ্কার রাখা এবং মাঝে মাঝে ঘড়ি খুলে রাখা ভালো।
চোখের যত্নও জরুরি
দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে চোখে ক্লান্তি, শুষ্কভাব ও ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা হতে পারে। যদিও শুধুমাত্র স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণেই মায়োপিয়া হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিন কিছু সময় খোলা পরিবেশে বা প্রাকৃতিক আলোতে কাটানো চোখের জন্য উপকারী। তবে বাইরে গেলে অবশ্যই সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে চোখকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
হাতের শক্তি কমছে কেন?
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং কম শারীরিক পরিশ্রম করার কারণে তরুণদের হাতের মুঠির শক্তি আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে। তাই শুধু ফোন কম ব্যবহার করাই নয়, নিয়মিত ব্যায়াম এবং হাত ও কবজির অনুশীলনও জরুরি।
শিশুদের মোটর স্কিলেও প্রভাব
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের হাত-চোখের সমন্বয় এবং সূক্ষ্ম মোটর স্কিলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তাদের শুধু মোবাইল বা ট্যাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আঁকাআঁকি, বই পড়া, খেলাধুলা, বাদ্যযন্ত্র শেখা কিংবা হাতে-কলমে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা উচিত।
শেষ কথা
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে, কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করার সময় সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া, ব্যায়াম করা এবং প্রতিদিন কিছুটা সময় খোলা পরিবেশে কাটানো—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই দীর্ঘমেয়াদে শরীরকে সুস্থ রাখতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: বিবিসি